ভারত-আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লাওস সফর

ভারত-আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লাওস সফর
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী ১০-১১ অক্টোবর লাওস সফর করবেন। এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ২১তম আসিয়ান-ভারত শীর্ষ সম্মেলন এবং ১৯তম পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করা। লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়ানে অনুষ্ঠিত হতে চলা এই দুটি বৈঠক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবছর এই শীর্ষ সম্মেলনগুলো আঞ্চলিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এবারের সম্মেলনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এটি এমন একটি সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মিয়ানমারে সামরিক শাসন এবং সেখানে চলমান সশস্ত্র সংঘাত আঞ্চলিক সংযোগ ও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
আসিয়ান-ভারত শীর্ষ সম্মেলন
প্রধানমন্ত্রী মোদির লাওস সফরকে ঘিরে ভারত ও আসিয়ানের মধ্যকার সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশা রয়েছে। আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংগঠন) এবং ভারত ১৯৯২ সাল থেকে বিভিন্ন স্তরে সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ২০০২ সালে শীর্ষ সম্মেলনের পর্যায়ে উন্নীত হয়। ভারত আসিয়ানের দশটি সদস্য দেশের সাথে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে চলেছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এ বছর শীর্ষ সম্মেলনে দুই পক্ষের মধ্যে প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য, এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। ভারত এবং আসিয়ান উভয়ই নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, যা মূলত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, সাইবার নিরাপত্তা, এবং সমুদ্র নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রগুলোকে কেন্দ্র করে।
পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলন
পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলন একটি বিস্তৃত বৈঠক, যেখানে আসিয়ান সদস্য দেশ ছাড়াও ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড অংশগ্রহণ করে। এই বৈঠক পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর আলোকপাত করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে এবারের পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সামরিক শাসনের প্রভাবে সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এই সংকট সমাধানের জন্য আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়াও, পড়ুন : টেক্সটাইল সফটনার বাজারের আকার 6.30% এর CAGR-এ বাড়ছে, এই প্রতিবেদনটি 2024-2030 টাইপ, বিভাজন, বৃদ্ধি এবং পূর্বাভাস দ্বারা বিশ্লেষণ কভার করে
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
লাওসে আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোদি বিভিন্ন আসিয়ান দেশের নেতাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এই বৈঠকগুলোর মাধ্যমে ভারত এবং আসিয়ানের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও দৃঢ় করার প্রচেষ্টা নেওয়া হবে। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ভারত ও আসিয়ানের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আসিয়ান দেশগুলোর সাথে ভারতের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়াও, ভারত আসিয়ানের বেশ কয়েকটি দেশের প্রধান বিনিয়োগের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। এই শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি আরও বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা করা হবে।
মিয়ানমার পরিস্থিতি
মিয়ানমারে চলমান সংঘাত এবং সামরিক শাসন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে। সশস্ত্র সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুতরভাবে অবনতি ঘটেছে, যা আঞ্চলিক সংযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এদিকে, আসিয়ান দেশগুলো মিয়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব পোষণ করছে, এবং এই শীর্ষ সম্মেলনে মিয়ানমার পরিস্থিতির সমাধানে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে।
ভারতের জন্য মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক সংযোগ ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতও মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব
আসিয়ান এবং পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের জন্য এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা একটি বড় লক্ষ্য। দক্ষিণ চীন সাগরের পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্পর্ক মজবুত করাই প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফর ভারত-আসিয়ান সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার পাশাপাশি পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত প্রভাব আরও দৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।