রতন টাটা’র অন্তিম যাত্রা: শিল্পপতি ও মানবহিতৈষীকে বিদায় জানাচ্ছে ভারত

রতন টাটা’র অন্তিম যাত্রা: শিল্পপতি ও মানবহিতৈষীকে বিদায় জানাচ্ছে ভারত
বিশিষ্ট শিল্পপতি এবং মানবহিতৈষী রতন টাটার জীবনাবসান হয়েছে। বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি গত কয়েক মাস ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৮৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তী। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর তাকে মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করলেও তাকে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। রতন টাটার মৃত্যুতে পুরো ভারত শোকস্তব্ধ, এবং শিল্প ও সমাজজগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রতন টাটা তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। ভারতীয় শিল্পপতির মধ্যে তিনি ছিলেন এক আলাদা পরিচয়ের অধিকারী, যিনি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেই সফল ছিলেন না, মানবতার ক্ষেত্রেও তার অনন্য অবদান রেখেছেন। তার নেতৃত্বে, টাটা গ্রুপ শুধু ভারতের বৃহত্তম কনগ্লোমারেট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেনি, বরং বিশ্বব্যাপী সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। টাটা গ্রুপের মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জনহিতকর কাজের জন্য ব্যয় হয়, যা সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করে।
তার নেতৃত্বে টাটা গ্রুপের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সমাজসেবামূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টাটা ট্রাস্টের অধীনে শিক্ষামূলক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের উন্নতির জন্য তিনি প্রচুর অবদান রেখেছেন। এছাড়া, তার মানবিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকল্প, যেগুলো দারিদ্র্যপীড়িত মানুষদের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত “জাগৃতি যুব” এবং “অগ্রণী স্বাস্থ্য প্রকল্প” এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ উপকৃত হয়েছে। তার ব্যক্তিগত সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি দান করেছেন, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মানবহিতৈষী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
রতন টাটা শুধু ভারতের অর্থনীতিতে নয়, বিশ্বের অর্থনীতিতেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। টাটা গ্রুপ বর্তমানে ১০০ টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ৭০০,০০০-এরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তার অধীনে, টাটা মোটর্স, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), টাটা স্টিল এবং টাটা কেমিক্যালসের মতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। টাটা মোটর্সের অধীনে “জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার” এর মতো নামিদামি ব্র্যান্ডও অধিগ্রহণ করা হয়, যা তাকে বিশ্বব্যাপী অন্যতম শ্রেষ্ঠ কনগ্লোমারেটগুলোর একটির প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রতন টাটার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যবসা শুধুমাত্র মুনাফার জন্য নয়, সামাজিক উন্নয়নের জন্যও পরিচালিত হওয়া উচিত। এই কারণেই তার নেতৃত্বে টাটা গ্রুপ বৈশ্বিক মানদণ্ডে টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তার ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাবের উপর ভিত্তি করে নেওয়া হতো।
রতন টাটার প্রয়াণে ভারত এক মহান নেতাকে হারালো। তাঁর কাজ, অবদান, এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব চিরকাল ভারতের শিল্প ও মানবহিতৈষণার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার বিদায়ে তার ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সহকর্মীরা শোকাহত। একবার তিনি বলেছিলেন, “যদি তোমার কাজ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে না পারে, তবে তা শুধুমাত্র ব্যবসা নয়, বরং এক অপূর্ণ দায়িত্ব।”