কলকাতার ডাক্তারের খুনের প্রতিবাদে ব্যাপক গণবিক্ষোভ, দুর্গাপূজা উৎসবে ছায়া

কলকাতার ডাক্তারের খুনের প্রতিবাদে ব্যাপক গণবিক্ষোভ, দুর্গাপূজা উৎসবে ছায়া

কলকাতার ডাক্তারের খুনের প্রতিবাদে ব্যাপক গণবিক্ষোভ, দুর্গাপূজা উৎসবে ছায়া

কলকাতা, অক্টোবর ০২, ২০২৪: কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রশিক্ষণরত এক ডাক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারে গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর, দুর্গাপূজার আয়োজনকারীরা রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান প্রকাশ করার কারণে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুর্গাপূজা আয়োজনকারীদের চাপে ফেলা হচ্ছে?

আগামী ৯ অক্টোবর থেকে রাজ্যের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হতে যাচ্ছে। এর কয়েকদিন আগেই কলকাতা এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর অনেক পূজা আয়োজনকারী মণ্ডলীরা রাজ্য সরকারের দেওয়া পূজা অনুদান ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছেন। ৮৫,০০০ টাকার এই অনুদান গ্রহণ না করার পেছনে প্রতিবাদী ডাক্তার হত্যার ঘটনার সমর্থনে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল।

কলকাতার একটি ক্লাবের এক সদস্য, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, “আমরা প্রথমে অনুদান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তাতে প্রশাসনিক চাপের কারণে আমরা আবার ভাবছি। যারা সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন, তাদেরকে প্রশাসনিক সমস্যা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।”

হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

আগস্ট ৯, ২০২৪-এ কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একজন প্রশিক্ষণরত ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। এই নৃশংস হত্যার পর, পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সাধারণ মানুষ থেকে চিকিৎসক, সকলেই প্রতিবাদে নেমে আসেন। পুলিশের ওপর তদন্তের ক্ষেত্রে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে, এবং সেই সঙ্গে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

প্রতিবাদী ডাক্তাররা কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়ালের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময়ে আন্দোলনরত চিকিৎসকরা তাকে “স্পাইনলেস” বলে সমালোচনা করেন এবং তাদের দাবির প্রতীক হিসাবে তাকে একটি মেরুদণ্ডের মূর্তি উপহার দেন। পরবর্তীতে গোয়ালকে কলকাতা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়।

উৎসবের আয়োজনকারীরা উদ্বিগ্ন

দুর্গাপূজার সময় রাজ্যের একাধিক স্থানে পুলিশ মোতায়েনের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিক্ষোভের পরিবেশের কারণে দুর্গাপূজার আয়োজনকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তারা মনে করছেন, পূজা মণ্ডলীতে কোনো রাজনৈতিক বার্তা বা সরকারের সমালোচনা করলে পুলিশ প্রশাসনের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কলকাতার এক পূজা কমিটির সদস্য জানান, “আমরা এই পূজায় কিছু প্রতীকী বার্তা প্রদর্শন করার পরিকল্পনা করছিলাম, যা বর্তমান পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করবে। কিন্তু প্রশাসনের তরফ থেকে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এমন কিছু করা হলে আমাদের পূজা মণ্ডলীর লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে।”

এছাড়াও, পড়ুন : উচ্চ বিশুদ্ধতা ধাতু গ্যালিয়াম বাজার – একটি বিশ্বব্যাপী এবং আঞ্চলিক বিশ্লেষণ


প্রশাসনের ভূমিকা ও সরকারের বক্তব্য

রাজ্য প্রশাসন থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সরকারি সূত্র থেকে জানানো হয়েছে, দুর্গাপূজা রাজ্যের সবচেয়ে বড় উৎসব, এবং প্রশাসন এই উৎসবকে নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এক সরকারি আধিকারিক বলেন, “রাজ্যে কোনো ধরনের অশান্তি বা অস্থিরতা আমরা বরদাস্ত করবো না। যারা আইন ভঙ্গ করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পূজা মণ্ডলীর আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই, কিন্তু কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

গণবিক্ষোভ ও প্রতিবাদের আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে

কলকাতা এবং এর আশেপাশের এলাকায় যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তা এখন রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশিক্ষণরত ডাক্তারের হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন শহরে মিছিল বের হচ্ছে। চিকিৎসকদের একাংশও কাজে না গিয়ে বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করছেন, এবং তারা দাবি করেছেন যে যতক্ষণ না পর্যন্ত ন্যায় বিচার পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ এই প্রতিবাদ চলবে।

বিক্ষোভকারীদের মধ্যে এক চিকিৎসক জানান, “আমরা যে ঘটনার শিকার হয়েছি, তা শুধু আমাদের নয়, গোটা সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। আমরা এর প্রতিবাদ করছি এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।”

দুর্গাপূজার আয়োজন ও প্রতিবাদ

প্রতিবাদের মাঝেই দুর্গাপূজার আয়োজনকারী মণ্ডলীর সদস্যরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। অনেকেই প্রথাগত পূজা আয়োজন চালিয়ে যেতে চান, তবে কয়েকটি বড় মণ্ডলী এবার পূজার সময় কোনো ধরনের রাজনৈতিক বার্তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা মনে করছেন, এমন কোনো বার্তা দিলে সরকারি প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

এক পূজা কমিটির প্রধান বলেন, “আমরা পূজা মণ্ডলীতে কোনো ধরনের বিতর্ক তৈরি করতে চাই না। দুর্গাপূজা একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এবং আমরা এই উৎসবকে শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে চাই।”

উপসংহার

প্রশিক্ষণরত ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলা গণবিক্ষোভের প্রভাব দুর্গাপূজার আয়োজনেও পড়ছে। দুর্গাপূজা আয়োজনকারী মণ্ডলীরা এখন রাজ্য প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে উৎসবের আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তবে তাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ থাকার অভিযোগ উঠেছে।