বিহারের বিষমদ কাণ্ড: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫, নীতীশ কুমার সরকারের মদ নিষেধাজ্ঞার উপর বিরোধীদের তোপ

বিহারের বিষমদ কাণ্ড: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫, নীতীশ কুমার সরকারের মদ নিষেধাজ্ঞার উপর বিরোধীদের তোপ
বিহারের সারন ও সিওয়ান জেলার বিষমদ কাণ্ডে বৃহস্পতিবার মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫-এ দাঁড়িয়েছে। আরও মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে, মিথাইল অ্যালকোহল শিল্পের জন্য ব্যবহৃত মদে মেশানো হয়েছিল, যার ফলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
সারন ও সিওয়ান জেলায় সন্দেহজনক বিষমদ সেবনের পর একাধিক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং তাদের চিকিৎসা চলছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে যে, বিষমদে মিশ্রিত মিথাইল অ্যালকোহলই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ।
মুখ্যমন্ত্রীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে রাজ্যের ডিজিপি অলোক রাজ এবং আবগারি ও মদ নিষেধাজ্ঞা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন, ঘটনার স্থানগুলোতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শন করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন
ঘটনার পরপরই দুটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। একটি স্থানীয় স্তরে কাজ করবে এবং সাম্প্রতিক এই ঘটনাটির অপরাধমূলক দিক খতিয়ে দেখবে। অপর একটি SIT পাটনা থেকে কাজ করবে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সব বিষমদ কাণ্ডের ওপর একটি সামগ্রিক গবেষণা করবে। সেই গবেষণার ভিত্তিতে একটি কার্যপরিকল্পনা তৈরি করা হবে বলে জানা গেছে।
নীতীশ কুমার সরকারের মদ নিষেধাজ্ঞা প্রশ্নের মুখে
বিহারের মদ নিষেধাজ্ঞা আইন, যা ২০১৬ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল, নতুন করে বিরোধীদের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে যে, মদ নিষেধাজ্ঞা আইন কার্যকর হলেও অবৈধ মদের ব্যবসা বন্ধ করা যায়নি। রাজ্যে বারবার বিষমদ কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি মদ নিষেধাজ্ঞা আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিহার বিধানসভার বিরোধী দলনেতা বিজয় সিং অভিযোগ করেছেন, “মদ নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন যে রাজ্যে মদ নিষিদ্ধ, অথচ প্রতিদিনই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ বিষমদের শিকার হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে রাজ্যের মানুষ আর কবে নিরাপদ হবে?”
বিরোধীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, মদ নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই কার্যকর রয়েছে, বাস্তবে এটি কোনো সুরক্ষা দিতে পারছে না। এর আগে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বিষমদ পানে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, তবে এবারের ঘটনা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে কারণ মৃতের সংখ্যা এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিষমদ পানের পর লক্ষণ ও চিকিৎসা
চিকিৎসকরা বলছেন, বিষমদ বা মিথাইল অ্যালকোহল মেশানো মদ সেবনের ফলে শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সাধারণত বিষমদ পানের পর মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট, দৃষ্টিশক্তি হারানো, এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। দ্রুত চিকিৎসা না করালে বিষমদ পানে মৃত্যুও হতে পারে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেশ কয়েকজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং ঘটনার তদন্তও চলছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রত্যেককে মিথাইল অ্যালকোহলের বিষক্রিয়া থেকে বাঁচাতে বিশেষ ধরনের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
মদ নিষেধাজ্ঞা আইন ও এর কার্যকারিতা
২০১৬ সালে বিহার সরকার রাজ্যে সম্পূর্ণ মদ নিষেধাজ্ঞা আইন চালু করেছিল। এই আইনের মাধ্যমে রাজ্যের মধ্যে মদ উৎপাদন, বিক্রি, ও সেবন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। তবুও, এর পরেও রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বেআইনি মদের কারবার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
অবৈধ মদের কারবারিদের বিরুদ্ধে কড়া আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক দিন ধরেই বিরোধী দল থেকে তুলে ধরা হচ্ছে। তাদের মতে, শুধুমাত্র মদ নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, অবৈধ মদের ব্যবসা বন্ধ করাও জরুরি।
স্থানীয় জনগণের অসন্তোষ
সারন ও সিওয়ান জেলার স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, রাজ্যে মদ নিষিদ্ধ থাকলেও বেআইনি মদের কারবারি রমরমা ব্যবসা করছে এবং প্রশাসনের এই বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা নেই।
এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “আমাদের এলাকায় মদ নিষিদ্ধ, কিন্তু তারপরও কিছু লোক বেআইনি মদ ব্যবসা চালাচ্ছে। পুলিশের নজরে না পড়ে, এমনটা কীভাবে সম্ভব? প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
এই ঘটনার পর, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান যে, এই বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।