বিবাহিত ধর্ষণ আইন বাতিল করা বিবাহগুলোকে অস্থিতিশীল করতে পারে: সুপ্রিম কোর্টকে কেন্দ্রের সতর্কতা

বিবাহিত ধর্ষণ আইন বাতিল করা বিবাহগুলোকে অস্থিতিশীল করতে পারে: সুপ্রিম কোর্টকে কেন্দ্রের সতর্কতা
বিবাহিত ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম তুলে দেওয়া হলে তা বিবাহের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে সুপ্রিম কোর্টকে সতর্ক করেছে কেন্দ্র। আদালতকে জমা দেওয়া একটি হলফনামায়, কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে যে, বিবাহিত ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা একটি “দূরগামী সামাজিক ও আইনি প্রভাব” রাখতে পারে। এই ইস্যু শুধুমাত্র সংবিধানিক নয়, এটি একটি জটিল সামাজিক বিষয় বলেও কেন্দ্রের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।
বিবাহিত ধর্ষণ আইনি ব্যতিক্রম
ভারতে প্রচলিত আইনে, ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC) এর ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, একজন স্বামী তার প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীকে ধর্ষণ করলে তাকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এটি বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, এবং এই ধারা বাতিলের জন্য একাধিক পিটিশন সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা হয়েছে।
কেন্দ্র বলেছে, বিবাহিত ধর্ষণ আইনি ব্যতিক্রমের মতো বিষয়গুলি বিচারিক পর্যালোচনার অধীনে আনার আগে এর সামাজিক প্রভাব এবং সংসদের অবস্থানকেও বিবেচনায় আনা উচিত। কেন্দ্রীয় সরকারের হলফনামায় জানানো হয়েছে যে, এটি কেবল সংবিধানিক প্রশ্ন নয়, বরং একটি সামাজিক প্রশ্ন যেখানে সংসদ পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
ভারতীয় দণ্ডবিধি থেকে ভারতীয় ন্যায় সনহিতা
ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্কের অপরাধ প্রমাণিত হলেও বিবাহিত ধর্ষণের ব্যতিক্রম রেখে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধি বাতিল করে নতুন ভারতীয় ন্যায় সনহিতা (BNS) পাস করা হয়, কিন্তু এই ব্যতিক্রমটি নতুন আইনে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।
বিবাহিত ধর্ষণ নিয়ে দায়ের করা একাধিক পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টে করা হলফনামায়, কেন্দ্র জানিয়েছে যে, সংসদের অবস্থানকে উপেক্ষা করে এই আইনকে বাতিল করা হলে তা সমাজের একটি অংশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
“সংবিধানিক ও সামাজিক প্রশ্ন”
হলফনামায় আরও বলা হয়েছে, “এ ধরনের বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনার সময় এটাও মনে রাখতে হবে যে এটি কেবল একটি সংবিধানিক প্রশ্ন নয় বরং মূলত একটি সামাজিক প্রশ্ন।” সংসদে বিতর্ক এবং আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়টিতে মতামত গ্রহণ করা হয়েছে, এবং বিষয়টি নিয়ে সংসদ একটি স্থির অবস্থান নিয়েছে। ফলে, বিষয়টিকে শুধু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তা পর্যাপ্ত হবে না বলে কেন্দ্রের মত।
কেন্দ্রের মতে, সংসদ বিবাহিত ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা করার সময় সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামত নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেছে, এবং বিষয়টি কেবল আইন প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই, বিচারালয়কে সংসদের মতামতকে বিবেচনা করতে হবে এবং বিষয়টির আইনি দিক ছাড়াও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করতে হবে।
বিচারবিভাগ এবং আইনসভা সম্পর্ক
বিবাহিত ধর্ষণ নিয়ে পিটিশনগুলিতে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিতে যাচ্ছে, তা বিচারবিভাগ ও আইনসভা সম্পর্কিত একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। বিচার বিভাগের ভূমিকা হল সংবিধান রক্ষা এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলি কেবল আদালতের বিষয় নয়, বরং সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে এটি নির্ধারিত হওয়া উচিত।
এছাড়াও, পড়ুন : বীজ বাজার: নীচ থেকে আপনার স্বপ্ন বাড়ান!
সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন
বিবাহিত ধর্ষণ আইনি ব্যতিক্রমের বিরুদ্ধে দায়ের করা একাধিক পিটিশনের মধ্যে কিছু বিষয় সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পিটিশনগুলিতে বলা হয়েছে যে, ধর্ষণ একটি অপরাধ, যা কোনো পরিস্থিতিতেই সহনীয় নয়। স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর প্রতি ধর্ষণও একইভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। আইন ও বিচার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি শুধুমাত্র একটি নারী অধিকার বা লিঙ্গবৈষম্য সম্পর্কিত বিষয় নয়, বরং এটি নারীর মৌলিক অধিকার সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিচারপতির মন্তব্য
বিচারপতিরা এই বিষয়টির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন যে, আইন ও বিচারব্যবস্থা শুধুমাত্র সংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার কাজ নয়, সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করাও তাদের দায়িত্ব। সুপ্রিম কোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত শুনানি করছে। বিষয়টির চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগে, বিচারপতিরা সংসদে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং এর প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের হলফনামা
হলফনামায় কেন্দ্র আরও বলেছে যে, সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই আইনি ব্যতিক্রম নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টির বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে সংসদ একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে এসেছে। আইন বাতিল করা হলে তা সমাজের একটি বৃহত্তর অংশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে কেন্দ্র মনে করে।
কেন্দ্র বলছে, সংসদ বিবাহিত ধর্ষণ আইনি ব্যতিক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সময় বিবাহিত নারীদের অধিকার, আইন, সামাজিক কাঠামো এবং পরিবারের গুরুত্ব সবকিছু বিবেচনা করেছে। তাই আদালতকে শুধুমাত্র সংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সমাজের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পিটিশনকারীদের বক্তব্য
পিটিশনকারীরা আদালতের কাছে আবেদন করেছে যে, বিবাহিত ধর্ষণও অপরাধের মধ্যে পড়ে, এবং এ ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি তার অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষার জন্য আইনগত প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রাখে। তাদের মতে, বিবাহিত ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম নারীদের জন্য একটি বড় অসুবিধা এবং এটি নারীর মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে।
পিটিশনকারীরা মনে করেন, সংবিধান অনুসারে প্রত্যেকের সমান অধিকার আছে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হওয়া ধর্ষণকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত।